
আলো (Light) ও তার ধর্ম
আলো হলো এক প্রকার শক্তি, যা নিজে অদৃশ্য কিন্তু অন্য বস্তুকে দেখতে সাহায্য করে। আলোর কোনো ভর নেই এবং এটি শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়েও চলাচল করতে পারে।
স্বপ্রভ ও নিষ্প্রভ বস্তু
- স্বপ্রভ বস্তু (Luminous Objects): যেসব বস্তুর নিজস্ব আলো আছে এবং যারা নিজেরাই আলো বিকিরণ করে, তাদের স্বপ্রভ বস্তু বলে। যেমন: সূর্য, তারা, জ্বলন্ত বাল্ব, জোনাকি ইত্যাদি।
- নিষ্প্রভ বস্তু (Non-luminous Objects): যেসব বস্তুর নিজস্ব কোনো আলো নেই, স্বপ্রভ বস্তুর আলোয় আলোকিত হয়, তাদের নিষ্প্রভ বস্তু বলে। যেমন: চাঁদ, বই, খাতা, টেবিল ইত্যাদি।
আলো চলাচলের মাধ্যম
আলো চলাচলের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মাধ্যমকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
- স্বচ্ছ মাধ্যম (Transparent): যে মাধ্যমের ভেতর দিয়ে আলো সহজেই যাতায়াত করতে পারে, তাকে স্বচ্ছ মাধ্যম বলে। যেমন: শূন্যস্থান, বাতাস, পরিষ্কার কাচ, পরিষ্কার জল।
- ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম (Translucent): যে মাধ্যমের ভেতর দিয়ে আলো খুব সামান্য বা আংশিকভাবে যাতায়াত করতে পারে, তাকে ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম বলে। যেমন: ঘষা কাচ, তেলমাখানো কাগজ, কুয়াশা।
- অস্বচ্ছ মাধ্যম (Opaque): যে মাধ্যমের ভেতর দিয়ে আলো একেবারেই যাতায়াত করতে পারে না, তাকে অস্বচ্ছ মাধ্যম বলে। যেমন: কাঠ, লোহা, পাথর।
আলোর সরলরৈখিক গতি ও সূচিছিদ্র ক্যামেরা
আলো সর্বদা সরলরেখায় চলাচল করে। একে আলোর সরলরৈখিক গতি বলে। আলোর এই ধর্মের একটি সুন্দর প্রয়োগ হলো সূচিছিদ্র ক্যামেরা (Pinhole Camera)। এই ক্যামেরায় কোনো লেন্স থাকে না, কেবল একটি ছোট্ট ছিদ্র থাকে। ছিদ্র দিয়ে আলো সরলরেখায় প্রবেশ করে পর্দার ওপর উল্টানো বা অবশীর্ষ (Inverted) প্রতিকৃতি গঠন করে। বস্তুর দূরত্ব কমালে প্রতিকৃতির আকার বড়ো হয় এবং দূরত্ব বাড়ালে প্রতিকৃতির আকার ছোটো হয়।
প্রচ্ছায়া ও উপচ্ছায়া (Umbra and Penumbra)
আলোর গতিপথে কোনো অস্বচ্ছ বস্তু রাখলে বস্তুর পেছনের পর্দায় যে অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান তৈরি হয়, তাকে ছায়া (Shadow) বলে। আলোর উৎস বড়ো হলে ছায়ার দুটি অংশ তৈরি হয়:
- প্রচ্ছায়া: ছায়ার মাঝখানের গাঢ় অন্ধকার অংশটিকে প্রচ্ছায়া বলে। এখানে আলোর কোনো রশ্মি পৌঁছাতে পারে না।
- উপচ্ছায়া: প্রচ্ছায়াকে ঘিরে থাকা আবছা অন্ধকার অংশটিকে উপচ্ছায়া বলে। এখানে আলোর উৎসের কিছু অংশ থেকে আলো পৌঁছাতে পারে।
আলোর প্রতিফলন (Reflection of Light)
আলো যখন কোনো মাধ্যমের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় অন্য কোনো মাধ্যমের তলে বাধা পেয়ে পুনরায় প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে, তখন সেই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন বলে। প্রতিফলনের দুটি সূত্র আছে, যার মধ্যে প্রধান সূত্রটি হলো: আপতন কোণ ($$i$$) সর্বদা প্রতিফলন কোণের ($$r$$) সমান হয়। অর্থাৎ, $$i = r$$।
প্রতিফলন সাধারণত দু-রকমের হয়: নিয়মিত প্রতিফলন (মসৃণ তলে যেমন আয়নায় হয়) এবং বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন (অমসৃণ তলে যেমন দেওয়াল বা বইয়ের পাতায় হয়)।
নিচের স্লাইডারটি টেনে আপতন কোণের মান পরিবর্তন করো এবং দেখো কীভাবে প্রতিফলন কোণ পরিবর্তিত হয়!
সূত্র: আপতন কোণ = প্রতিফলন কোণ ($$i = r$$)
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (মান – ১)
উত্তর: আলো হলো এক প্রকার শক্তি, যা নিজে অদৃশ্য কিন্তু আমাদের দেখতে সাহায্য করে।
উত্তর: স্বপ্রভ বস্তু: সূর্য। নিষ্প্রভ বস্তু: চাঁদ।
উত্তর: ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম।
উত্তর: প্রতিফলন কোণের মানও $$40^{\circ}$$ হবে (কারণ আপতন কোণ = প্রতিফলন কোণ)।
উত্তর: উল্টানো বা অবশীর্ষ প্রতিকৃতি গঠিত হয়।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (মান – ২)
উত্তর: যে মাধ্যমের ভেতর দিয়ে আলো সহজেই যাতায়াত করতে পারে তাকে স্বচ্ছ মাধ্যম বলে (যেমন- কাচ)। আর যে মাধ্যমের ভেতর দিয়ে আলো একেবারেই যাতায়াত করতে পারে না তাকে অস্বচ্ছ মাধ্যম বলে (যেমন- কাঠ)।
উত্তর: সূচিছিদ্র ক্যামেরার ছিদ্রটি বড়ো করা হলে সেটি অসংখ্য ছোটো ছোটো ছিদ্রের সমষ্টিরূপে কাজ করবে। এর ফলে অসংখ্য প্রতিকৃতি তৈরি হবে যারা একে অপরের ওপর উপরিপাতিত হবে। ফলস্বরূপ, পর্দায় গঠিত প্রতিকৃতিটি অস্পষ্ট ও ঝাপসা হয়ে যাবে।
উত্তর: নিয়মিত প্রতিফলনের উদাহরণ হলো— আয়নার ওপর আলোর প্রতিফলন। বিক্ষিপ্ত প্রতিফলনের উদাহরণ হলো— দেওয়াল, সিনেমার পর্দা বা বইয়ের পাতার ওপর আলোর প্রতিফলন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (মান – ৩)
উত্তর: আলোর গতিপথে কোনো অস্বচ্ছ বস্তু রাখলে বস্তুর পেছনে যে ছায়া সৃষ্টি হয়, তার গাঢ় অন্ধকার অংশটিকে প্রচ্ছায়া এবং তাকে ঘিরে থাকা আবছা অন্ধকার অংশটিকে উপচ্ছায়া বলে।
যখন আলোর উৎসটি বিন্দুর মতো ছোটো হয়, তখন কেবল প্রচ্ছায়া গঠিত হয়। কিন্তু আলোর উৎস যখন আকারে বড়ো (বিস্তৃত উৎস) হয়, তখন ওই বড়ো উৎস থেকে আসা আলোর কিছু অংশ অস্বচ্ছ বস্তুকে অতিক্রম করে প্রচ্ছায়ার চারপাশের কিছু জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যার ফলে ওই জায়গাটি সম্পূর্ণ অন্ধকার না হয়ে আবছা অন্ধকার হয়। এভাবেই উপচ্ছায়ার সৃষ্টি হয়।
উত্তর: সিনেমার পর্দা অমসৃণ রাখা হয় যাতে পর্দার ওপর পড়া আলোর বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন ঘটে। বিক্ষিপ্ত প্রতিফলনের ফলে আলো সিনেমা হলের সবদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে হলের যেকোনো জায়গায় বসা দর্শক সিনেমাটি পরিষ্কার দেখতে পান।
পর্দা সাদা রাখা হয় কারণ সাদা রং সমস্ত বর্ণের আলোকে প্রতিফলিত করতে পারে, কোনো রংকে শোষণ করে না। ফলে সিনেমার আসল রংগুলি অবিকৃত অবস্থায় দর্শকের চোখে পৌঁছায়।
