
মানব বিকাশের বিভিন্ন দশা (Phases of Human Development)
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মানব বিকাশকে প্রধান পাঁচটি দশায় ভাগ করা যায়। এই দশাগুলি হলো— সদ্যোজাত, শৈশব, বয়ঃসন্ধি, পরিণত দশা এবং অন্তিম পরিণতি দশা বা বার্ধক্য। নিচে দশাগুলির পর্যায়ক্রমিক আলোচনা করা হলো:
ভ্রূণ মাতৃগর্ভে ৯ মাস ১০ দিন প্রতিপালিত হওয়ার পর ভূমিষ্ঠ হয়। একে সদ্যোজাত দশা বলে। সদ্যোজাত দশা হলো ০-১ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কাল। এই দশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- জন্মের সময় শিশুর স্বাভাবিক ওজন ২.৫ কেজি (kg) থেকে ৩ কেজি (kg) হয়।
- শিশু মায়ের মুখমণ্ডল চিনতে পারে।
- শব্দ ও আলোকের উৎসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাকে অনুসরণ করে।
- কথা বলতে পারে না বলে, মূলত কান্না দিয়ে নিজের মনের ভাব (যেমন- খিদে পাওয়া, কষ্ট হওয়া) প্রকাশ করে।
১ বছর থেকে ১১ বছর বয়সকালকে শৈশবকাল বলে। এই দশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- জন্মের পর প্রথম তিন বছর শিশুর উচ্চতা অত্যন্ত দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়।
- শৈশবের শুরুতে মাথার আকৃতি দেহের তুলনায় কিছুটা বড়ো দেখালেও, ধীরে ধীরে পরিণত বয়সে মাথা স্বাভাবিক আকারের হয়ে যায়।
- শিশুরা এই সময় ধীরে ধীরে কথা বলতে শেখে এবং ভাষা আয়ত্ত করে।
- শিশুর বুদ্ধি, স্মৃতি, চিন্তা ও আবেগ প্রকাশ করার ক্ষমতা তৈরি হয়।
- পরিবেশ এবং চারপাশের মানুষের সম্বন্ধে নিজস্ব ধারণা তৈরি হয় ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটে।
- তবে এই দশায় জনন গ্রন্থি পরিণত হয় না।
১২ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত দশাকে বয়ঃসন্ধিকাল বলে। এই সময়কালকে মানুষের মুখ্য বৃদ্ধিকাল (Primary growth period) বলা হয়। এই দশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- এই সময় বিভিন্ন হরমোনের প্রভাবে বালক-বালিকাদের দেহে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায় এবং যৌনলক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়।
- দেহের বিকাশ খুব ভালোভাবে ঘটে, যার ফলে স্বাস্থ্যবান ও পেশিবহুল শরীর গঠন হয়।
- পিটুইটারি গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোনগুলির সক্রিয়তায় দেহের সর্বাঙ্গীণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটে।
- এই দশায় যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন (পুরুষদেহে) এবং ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন (স্ত্রীদেহে)-এর ক্রিয়ার ফলে যৌনাঙ্গের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।
১৮ থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কালকে পরিণত দশা বলে। এই দশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- এই দশায় মানবদেহে যৌন অঙ্গ অর্থাৎ শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়ের পূর্ণ বিকাশ ঘটে এবং এর সঙ্গে তাদের কার্যকারিতাও বৃদ্ধি পায়।
- এই বয়সের মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায় এবং কর্মজীবনে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করে।
- জনন অঙ্গগুলি পরিপূর্ণতা লাভ করায় এরা সন্তান উৎপাদন ও প্রতিপালন করতে সক্ষম হয় এবং সংসার ধর্ম পালন করে।
৬০ বছরের পর থেকে মানবদেহে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই বার্ধক্য দশা চলতে থাকে। এই দশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- এই সময় বহু কোশের মৃত্যু ঘটায় দেহে বার্ধক্যের ছাপ পড়তে শুরু করে।
- কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার ফলে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, আবার অনেকে বিভিন্ন সংস্কারমূলক বা সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োগ করে।
- ত্বকের কুঞ্চন (বলিরেখা পড়া), কানে কম শোনা, অস্থি ও অস্থিসন্ধি ক্ষয় পাওয়া এবং রক্তচাপ বৃদ্ধিসহ নানারকম রোগ শরীরে দেখা দেয়।
- এই সময় সহজপাচ্য আহার গ্রহণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো, মর্নিং ওয়াক (Morning walk) এবং যোগাভ্যাস করা অত্যন্ত দরকার।
A. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন বা MCQ (প্রশ্নমান – ১)
উত্তর: (গ) ৫টি
উত্তর: (খ) বয়ঃসন্ধি
উত্তর: (গ) ১২-১৮ বছর
উত্তর: (ঘ) বার্ধক্য
উত্তর: (খ) ২.৫ – ৩ কেজি
B. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (প্রশ্নমান – ১)
C. সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (প্রশ্নমান – ২)
- এই দশায় শিশুর বুদ্ধি, স্মৃতি, চিন্তা ও আবেগের প্রকাশ ঘটতে থাকে এবং পরিবেশ সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা তৈরি হয়।
- জন্মের প্রথম তিন বছর শিশুর উচ্চতা খুব দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায় এবং শিশু কথা বলতে শেখে। তবে এই দশায় জনন গ্রন্থি পরিণত হয় না।
- এই দশায় জনন অঙ্গ অর্থাৎ শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়ের পূর্ণ বিকাশ ঘটে এবং এরা সন্তান উৎপাদন ও প্রতিপালনে সক্ষম হয়।
- এই বয়সের মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়, কর্মজীবনে স্বনির্ভর হয় এবং সংসার ধর্ম পালন করে।
- বহু কোশের মৃত্যুর ফলে ত্বকে বলিরেখা পড়ে বা ত্বক কুঁচকে যায় এবং কানে শোনার ক্ষমতা কমে যায়।
- অস্থি ও অস্থিসন্ধির ক্ষয় দেখা দেয়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং মানবদেহে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়।
D. দীর্ঘ বা রচনাধর্মী প্রশ্ন (প্রশ্নমান – ৩ বা ৫)
মানব বিকাশকে প্রধান পাঁচটি দশায় ভাগ করা যায়। এগুলি হলো— ১. সদ্যোজাত, ২. শৈশব, ৩. বয়ঃসন্ধি, ৪. পরিণত দশা এবং ৫. বার্ধক্য বা অন্তিম পরিণতি দশা।
বয়ঃসন্ধি দশায় পরিবর্তন:
বয়ঃসন্ধিকাল বা কৈশোর দশায় (১২-১৮ বছর) মানবদেহে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়:
- শারীরিক বৃদ্ধি: এই সময়ে পেশি ও অস্থির দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোনের প্রভাবে দেহের সর্বাঙ্গীণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটে এবং স্বাস্থ্যবান শরীর গঠিত হয়।
- যৌনলক্ষণ প্রকাশ: বালক-বালিকাদের দেহে গৌণ যৌনলক্ষণগুলি সুস্পষ্ট হতে শুরু করে।
- যৌন হরমোনের প্রভাব: পুরুষদেহে টেস্টোস্টেরন এবং স্ত্রীদেহে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ক্ষরণ বাড়ে। এর ফলে উভয়েরই জননাঙ্গের দ্রুত বিকাশ ও পরিণতি ঘটতে থাকে।
- এই দশায় শিশু মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়। জন্মের সময় ওজন ২.৫-৩ কেজি থাকে।
- শিশু শব্দ ও আলোকের উৎসকে অনুসরণ করে এবং মায়ের মুখমণ্ডল চিনতে শেখে।
- ভাষার বিকাশ না হওয়ায়, শিশু কান্নার মাধ্যমে নিজের মনের ভাব (যেমন খিদে বা কষ্ট) প্রকাশ করে।
- মানব বিকাশের এটি শেষ দশা, যেখানে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বার্ধক্য শুরু হয়।
- ত্বক কুঁচকে যাওয়া, কানে কম শোনা, অস্থি ও অস্থিসন্ধির ক্ষয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির মতো নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
- কর্মজীবন থেকে অবসরের কারণে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়, তাই এই সময় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, যোগাভ্যাস ও মর্নিং ওয়াক করা খুবই জরুরি।
